গুলশানে পথচারীর মৃত্যু: রডটি আসলে কোথা থেকে পড়েছিল? বিজ্ঞান ও বাস্তবতার অনুসন্ধানে নতুন তথ্য
গুলশানে রড পড়ে পথচারীর মৃত্যুর ঘটনায় গাণিতিক বিশ্লেষণ এক নতুন মোড় দিয়েছে। ২৫ তলা উঁচু কনকর্ড ভবন থেকে ৪০ ফুট দূরে রড পড়া বিজ্ঞানের হিসেবে প্রায় অসম্ভব, কারণ মহাকর্ষ বল বস্তুকে সোজাসুজি নিচে টানে। অন্যদিকে, নিহতের অবস্থান থেকে মাত্র ২ ফুট দূরত্বে থাকা ক্রিস্টাল প্যালেস ভবনে তখন গ্লাস ক্লিনিংয়ের কাজ চলছিল। এই দূরত্ব ও অবস্থানের পার্থক্যই এখন ঘটনার মূল রহস্য।
রাজধানীর গুলশানে নির্মাণাধীন ভবনের রড পড়ে পথচারীর মৃত্যুর ঘটনায় শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ঘটনার জন্য কনকর্ড গ্রুপের নির্মাণাধীন ভবন 'এমআরবি স্কাইলাইন' (MRB Skyline)-কে দায়ী করা হলেও, ঘটনাস্থলের দূরত্ব এবং বিজ্ঞানের গাণিতিক সূত্র এক নতুন রহস্যের জন্ম দিয়েছে।
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও পাল্টাপাল্টি দাবি
গত ২২ জানুয়ারি গুলশান ১৪০ নম্বর রোডের ক্রিস্টাল প্যালেস ভবনের সামনে এক পথচারী লোহার রড পড়ে প্রাণ হারান। ঘটনার পর একদল দাবি করেন, রাস্তার উল্টো পাশে থাকা কনকর্ডের ২৫ তলা ভবন থেকে রডটি পড়েছে। তবে অন্যদলের দাবি, রডটি পাশের 'ক্রিস্টাল প্যালেস' ভবন থেকেই পড়েছে, যেখানে গ্লাস ক্লিনিংয়ের কাজ চলছিল।
গাণিতিক বিশ্লেষণ: ২৫ তলা থেকে ৪০ ফুট দূরত্বে পড়া কি সম্ভব?
নিউজ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এক চমকপ্রদ গাণিতিক ব্যাখ্যা। কনকর্ডের ২৫ তলা ভবনটির উচ্চতা প্রায় ৩১২ ফুট। গ্যালিলিওর মুক্তভাবে পড়ন্ত বস্তুর সূত্র (Free Fall Motion) অনুযায়ী, কোনো বস্তু ৩১২ ফুট ওপর থেকে পড়লে মাটিতে পৌঁছাতে সময় লাগবে মাত্র ৪.৪ সেকেন্ড।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নিহত ব্যক্তি কনকর্ডের ভবন থেকে প্রায় ৪০ ফুট দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। মহাকর্ষ বল কোনো বস্তুকে সরাসরি নিচের দিকে টানে, আড়াআড়ি বা সাইডওয়েতে নয়। যদি কনকর্ডের ভবন থেকে রডটি পড়তে হয়, তবে সেটিকে প্রতি সেকেন্ডে ৯ ফুট করে আড়াআড়ি দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে। কিন্তু একটি স্থির ভবন থেকে কোনো বস্তু নিজে নিজে এত গতিতে আড়াআড়িভাবে ৪০ ফুট দূরে গিয়ে পড়া প্রায় অসম্ভব, যদি না কেউ সেটি সজোরে ছুড়ে মারে।
ক্রিস্টাল প্যালেসের সংশ্লিষ্টতা কতটুকু?
ঘটনার বিবরণে দেখা যায়, ক্রিস্টাল প্যালেস ভবনে তখন ঝুলন্ত প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে গ্লাস ক্লিনিংয়ের কাজ চলছিল। নিহত ব্যক্তি এই ভবন থেকে মাত্র ২ ফুট দূরত্বে অবস্থান করছিলেন। উচ্চতা কম হওয়ায় এবং অবস্থান খুব কাছে থাকায়, এখান থেকেই রড পড়ার সম্ভাবনা গাণিতিকভাবে অনেক বেশি জোরালো। এছাড়া ওই ভবনের ছাদেও রডের অস্তিত্ব পাওয়ার কথা জানিয়েছে কনকর্ড কর্তৃপক্ষ।
নিরাপত্তার প্রশ্ন ও আইনি পদক্ষেপ
যদিও কনকর্ড ভবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, তবে সরেজমিনে দেখা গেছে সেখানে সেফটি নেট ও গ্লাস কাস্টিংয়ের আবরণ রয়েছে। অবাক করার বিষয় হলো, কনকর্ডের বিরুদ্ধে মামলা হলেও এখন পর্যন্ত সম্ভাব্য উৎস হিসেবে 'ক্রিস্টাল প্যালেস' কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কোনো আইনি পদক্ষেপের তথ্য পাওয়া যায়নি।
একটি তাজা প্রাণ ঝরে যাওয়া অত্যন্ত বেদনাদায়ক। তবে আবেগ বশবর্তী হয়ে কাউকে দায়ী করার আগে সঠিক তদন্ত প্রয়োজন। গাণিতিক হিসাব এবং ঘটনাস্থলের দূরত্ব যে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে, তা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। সুষ্ঠু তদন্তই বলে দেবে এই মৃত্যুর দায় কার এবং কোন অবহেলার বলি হলেন ওই পথচারী।